Sunday, October 5, 2008

অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অবারিত দ্বার নোয়াখালী

অতি প্রাচীন ইতিহাস সম্বৃদ্ধ নোয়াখালী জেলা। ১৯২১ থেকে ২০০৮ সাল। দীর্ঘ ১৮৭ বছর ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় এ জেলার সন্তানদের বীরোচিত ত্যাগ জাতিকে করেছে মহিমান্বিত, জেলাবাসী হয়েছে গর্বিত। প্রকৃতির অপার রূপ আর সম্পদ সম্বৃদ্ধ এ জেলার ফসলের ভান্ডার উদ্বৃত্ব। কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য, পশু, মৎস্য সম্পদ, তাঁত বস্ত্র, লবন চাষ (বর্তমানে বিলুপ্ত) রপ্তানী করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ইতিহাসও সুদীর্ঘ কালের। কালের পরিক্রমায় প্রকৃতির খেয়ালে বহুবার নোয়াখালীর উপকূল ভেঙ্গেছে আবার গড়েছে। ভাঙ্গা গড়ার এ চোরাবালির মাঝে মানুষ নিঃস্বও হয়েছে আবার সম্বৃদ্ধ হয়েছে।

নোয়াখালীর ৭০ ভাগ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে কৃষিজীবি। প্রকৃতিকে নির্ভর করে গ্রামের বনেদীগৃহস্থ পরিবার ছিল স্বয়ম্ভর। তবে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার সুযোগের অভাবে কৃষিতে এসেছে সংকট। সে সংকট অব্যাহত। গত দু'দশক ধরে নতুন সর্বনাশ জলাবদ্ধতা জেলার কৃষি ব্যবস্থাকে কেবল ধ্বংস করেনি, বিরাণ করেছে গ্রামীন অর্থনীতিকে। বাড়িয়েছে বেকারত্ব। সম্পন্ন কৃষক ও কৃষি পরিবার হয়েছে সর্বশান্ত। পেশা বদল করে অনেকে কৃষি বিমুখ হওয়ায় কৃষিতে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন জনবল সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। অথচ স্বাধীনতার পরবর্তী সরকার ব্যবস্থার সকল পর্যায়ে নোয়াখালীর বিদগ্ধ সন্তানদের উজ্জ্বল উপস্থিতি থাকলেও কৃষি নির্ভর জেলার কৃষিখাতে সংকট সমাধানে কেউ এগিয়ে আসেনি। সাবেক ৬ উপজেলা এখন প্রশাসনিক প্রয়োজনে ৯ উপজেলায় রূপান্তরিত। তাতে মানুষের উন্নয়ন হবে এ আশাবাদ করা যেতে পারে। কিন্তু নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ ও হাতিয়া উপজেলা ছাড়া বাকী ৭ উপজেলা বর্ষা মৌসুম ও মৌসুম পরবর্তী ২ মাস জলাবদ্ধ থাকে কৃষি জমি। দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা কৃষির যে বিপর্যয় এনেছে তা থেকে উত্তোরনের কোন সঠিক পরিকল্পনা নেই। রাসায়নিক দাহ্য পদার্থের আগুনের লেলিহান শিখার মত দ্রব্য মূল্য যখন মানুষকে সর্বাঙ্গে পুড়তে শুরু করেছে তখন আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার টনক নড়েছে। গত দু'দশকে কৃষি আর কৃষকের প্রতি যে অবহেলা তার প্রতিশোধ নিচ্ছে দ্রব্য মূল্য। সুজলা, সুফলা শস্য শ্যামলা বাংলাদেশের কৃষিকে কার স্বার্থে বিদেশী বাজারে পরিণত করে এর অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্থ করেছে তার মূল্যয়ান করা সময়ের দাবী।

নোয়াখালীর কৃষির বিশাল সম্ভাবনা হলেও প্রায় ৬৫ হাজার একর জমি এখনো সারা বছর পতিত থাকে। একফসলী জমির পরিমাণ ৪৭ হাজার একর। কৃষি জমির বিশাল ভান্ডার উপকূল জুড়ে। সেখানে সীমিত সুযোগ নিশ্চিত হলে ৮০হাজার একর জমিকে ত্রি-ফসলী করা সম্ভব। অথব জলাবদ্ধতা, সেচের অভাব, সার সংকট, কীটনাশক সংকট ছাড়াও ভেজাল বীজ, সার, ঔষধ কৃষি এবং কৃষকের অস্তিত্বকে হুমকিতে ফেলেছে।
এ জেলায় মৌসুমী বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশী। পরিকল্পিত নিষ্কাশন ব্যবস্থা সেভাবে গড়ে উঠেনি। গত তিন দশকে উন্নয়নের জোয়ারে পুল, কালভার্ট, রাস্তা অবকাঠামতে হয়নি তা বলা যাবে না, তবে মূল বিষয় খাল সংস্কার, পানি নিষ্কাশন ও সেচ সুবিধার বিষয়ে জনগণের দীর্ঘদিনের দাবী পুরোপুরি উপেতি হয়েছে। মেঘনা আর ডাকাতিয়া নদীর সাথে সংযোগে খালগুলো মরে যাচ্ছে, বেদখল হয়েছে প্রভাবশালীদের দ্বারা অথচ প্রশাসন সহ সংশ্লিষ্টরা এগুলোকে আমলে নেয়নি। বরং কতিপয় ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছে।

উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার একর অনাবাদি জমি পতিত পড়ে রয়েছে। সেচ সুবিধার অভাবে প্রতি বছর ৭০ হাজার একর জমিতে ফসল বুনন হয় না। হাতিয়া ভাঙছে গত তিন দশকের বেশী সময় ধরে, দেখার কেউ নেই। কতিপয় রাজনৈতিক নেতা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, অসাধু সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারী ও প্রভাবশালীদের মদদে ৫০ হাজার হেক্টরের বনাঞ্চল উজাড় হয়েছে। ঝড় জলোচ্ছাসে উপকূলের কতিপয় অঞ্চলে কয়েক লাখ মানুষ এখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। তাদের থাকার কোন ব্যবস্থা নেই। গরু, মহিষ, ভেড়া তথা পশু সম্পদ সম্বৃদ্ধ উপকূলে এখন পশুর অভাব। কথিত ভূমিহীন ও মৎস্য চাষীরা খাস জমি দখল করে ফেলছে। অথচ পশুদের জন্য চারণভূমি নেই। সরকারের পরিকল্পিত উপকূল উন্নয়নের ফাইলে উই পোকা ধরেছে। এ কারণে উপকূলের কথিত উন্নয়ন এখন শীতাতপ হলঘরে, সেমিনার, টকশোতে সীমাবদ্ধ।
উপকূলের কৃষক নতুন ফসলে উৎপাদনে আগ্রহী হয়েছে। গত ১০ বছরে উপকূলীয় এলাকায় তরমুজ, ঢেঁড়স, সয়াবিন, বাদাম, ভূট্টা ও গমের চাষ হচ্ছে। সবজি চাষে আগ্রহী কৃষক আগাম শীতের সবজি বাজারে নিয়ে আসছে। অথচ তাদের জন্য প্রযুক্তি, বীজ, সার, প্রয়োজনীয় তথ্য, সেচ ব্যবস্থা ইত্যাদি সুযোগ খুবই সীমিত। সংশ্লিষ্ট বিভাগে লোকবল সংকটও রয়েছে। প্রান্তিক চাষীর জমি নেই। অথচ তার উদ্যোগ ও মেধা আছে। তা কাজে লাগানোর নিশ্চয়তা চায়। চায় উৎপাদিত পণ্যের মালিকানা ও খাস ভূমি।

সরকার বলছে, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আনতে হবে। অথচ এর জন্য প্রয়োজনীয় সাপোর্ট পায় না কৃষক। ব্যক্তি মালিকানা ও খাস ভূমির মালিকানা সামন্ত প্রভু ও প্রভাবশালীদের। তারা চাষ করে না। এ জন্য জমি চাষে বাধ্য করার আইন প্রয়োজন। এ জেলায় খামার ভিত্তিক গবাদি পশু, মৎস্য চাষ, হাঁস-মুরগী, মৌসুমী ফল ও সবজি চাষের ব্যাপক প্রসার ঘটছে। তবে এর উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সুবিধা সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে পাওয়া যায় না। মৎস্য চাষে উপকূলীয় অঞ্চলে আরেকটি নতুন বিপ্লব ঘটেছে। সরকারী খাস জমি ও ব্যক্তিগত জমিতে বৈধ অবৈধ ভাবে গড়ে উঠা মৎস্য প্রকল্প থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫০ টন মাছ বাজারে আসছে। এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছে আধুনিক হ্যাচারী, দুগ্ধ খামার, ফিড প্রসেসিং কারখানা সবই হচ্ছে পরিকল্পনাহীন ভাবে। ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ২টি ফিশ প্রসেসিং কারখানা গড়ে উঠেছে, যা শুরুতেই বন্ধ হয়ে গেছে। এই ধরনের প্রকল্পগুলোকে পরিকল্পিত ভাবে এবং সুচিন্তিত ভাবে বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। সম্প্রতি সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদের সুচিন্তা প্রসূত ফোর কাউ, গুটি ইউরিয়া, জৈব সার, বায়োগ্যাস প্রকল্প ও ক্ষুদ্র সমবায় ভিত্তিক প্রকল্পগুলো গ্রামীন জনপদের কৃষকের মাঝে আশার সঞ্চার করেছে। সেনাবাহিনীর কারিগরী সহযোগিতায় এই ধরনের প্রকল্প বেকারত্ব নিরসনে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

নোয়াখালীর পর্যটন শিল্প সম্ভাবনা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরো একটি উদ্যোগ হতে পারে। বিদ্যুৎ, পানীয় জল অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে নিঝুম দ্বীপ, চরকার্ক-সন্দ্বীপ চ্যানেল, কোম্পানীগঞ্জের মুছাপুর সহ বিশাল অঞ্চল জুড়ে পৃথক পর্যটন শিল্পের বিকাশ সম্ভব। এছাড়া ৪৩ কিলোমিটার লম্বা ঐতিহাসিক নোয়াখালী খালটি হতে পারে পর্যটন শিল্প বিকাশের আরেকটি অন্যতম উপাদান। জেলার উপকূলের ১৫শ বর্গকিলোমিটার জুড়ে গড়ে তুলতে হবে পরিকল্পিত ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। পরিবেশের জন্য যা হবে খুবই প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষকে রক্ষা করার জন্য প্রকৃতির এ দেয়াল গড়ে তোলার বিকল্প নেই। একই সাথে পরিবেশ, প্রতিবেশ এবং জীব বৈচিত্রকে রক্ষা করার জন্য বনায়ন, বিশাল বিশাল জলাশয় খনন খুবই জরুরী, যা পাল্টে দেবে এ জনপদের মানুষের জীবন যাত্রাকে।
নোয়াখালীতে ইতিমধ্যে বেশকিছু উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, এগ্রিকালচার ট্রেনিং ইনিস্টিটিউট, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, নার্সিং ট্রেনিং ইনিস্টিটিউট, মেডিকেল এ্যাসিসটেন্ট ট্রেনিং স্কুল (ম্যাট্স), পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার অন্যতম। তবে জনসংখ্যার বিচারে এবং আয়তনের বিশালতায় সেই হিসেবে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থা তেমন উন্নতি ঘটেনি। মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাবে প্রতিবছর বহু মেধাবী ছাত্রছাত্রী শি সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ থেকে উত্তোরনের প্রয়োজন, প্রয়োজন আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসার। আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি নোয়াখালীতে মেডিকেল কলেজ, ইপিজেড, নৌ বন্দর, সুবর্ণচর পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারণ ও নির্মাণের বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই হচ্ছে; যা হবে স্থল ও নৌ পথে বহুমুখী বাণিজ্য প্রসারের একটি বিশাল উদ্যোগ।

নোয়াখালীর জেলার সন্তানরা যারা উচ্চ পর্যায়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন, তারা বিষয়গুলো নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে দেন-দরবার করে এ উদ্যোগ গুলোর সফল বাস্তবায়ন করবেন- এ প্রত্যাশা জেলাবাসী করে। অবশ্যই বিষয়গুলো করুণা নয়, নোয়াখালীর মানুষ ইতিহাসে অনেক পংকিল পথে সাহসী ভূমিকা নিয়ে মানুষের পক্ষে দেশের পক্ষে দাড়িয়েছে, হারিয়েছে অনেক কিছু, সে তুলনায় পায়নি কিছুই। যে উদ্যোগ গুলো নিয়ে আলোচনা চলছে তা হবে দেশের জন্য, দেশের অর্থনীতির জন্য সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। এগুলো বাস্তবায়ন দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থেই করতে হবে।

লেখক : বিজন সেন
নোয়াখালী প্রতিনিধি, চ্যানেল আই ও দৈনিক ভোরের কাগজ
নিয়মিত লেখক, নোয়াখালী ওয়েব

1 comment:

RIYAD said...

Thank you very much Mr. vejon for your well informative story.
I would like to see more from you.
Thanks again.
Riyad Hossain
United Kingdon (London)